সম্পত্তি এওয়াজ বা বিনিময় সম্পর্কে যে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অবশ্যই যানা দরকার

সম্পত্তি এওয়াজ বা বিনিময় সম্পর্কে যে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অবশ্যই যানা দরকার

সম্পত্তির এওয়াজ বা বিনিময় বিষয়টি বাংলাদেশের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন সমর্থন করে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে সম্পত্তি বিনিময় করলে সেটা কি বিক্রয় ইন বাদামের মত সঠিক হয় কিনা। সম্পত্তি বিনিময় করার ফলাফল কি? সম্পত্তি বিনিময় করে সেই বিনিময় কি আবার বাতিল করা যায়? সম্পত্তি বিনিময় করার পরে যদি সেই সম্পত্তি বিক্রি করে দেওয়া হয় তাহলে কি সেই বিনিময় টি বাতিল করা সম্ভব?

সম্পত্তি এওয়াজ বা বিনিময় আমাদের মনে এইসব বিভিন্ন প্রশ্নের অবতারণা সব সময় হয়ে থাকে কিন্তু কখনো কি গভীরভাবে ভেবে দেখেছেন যে এগুলো কীভাবে সম্ভব এগুলো হয় কিনা? আপনি যখন কোন সমস্যায় পড়েছেন এই বিনিময় সম্প্রতি নিয়ে তখন হয়তো অ্যাডভোকেট মহোদয়ের কাছে গিয়ে সেই বিষয়ে সমাধানের চেষ্টা করেছেন কিন্তু অনেক সময় এই ছোট ছোট সমস্যাগুলো অ্যাডভোকেট মহোদয়ের কাছে না গিয়েও আপনি নিজেও বুঝতে পারেন।

বাংলাদেশের সম্পত্তির বিনিময় বহু আগে থেকে হয়ে আসছে। এটা এক ধরনের প্রথা বলা যায়। অর্থনীতিতে দ্রব্য বিনিময় প্রথা বলে একটা বিষয় আছে যেটা পৃথিবীতে ছিল টাকা বা মুদ্রা আবিষ্কারের পূর্বে বর্তমানে এই বিষয়টা একেবারেই নেই বললেই চলে। কিন্তু সম্পত্তির ক্ষেত্রে এ বিষয়টি এখনো বিরাজমান। বাংলাদেশের প্রচলিত সম্পত্তি হস্তান্তর আইন বিষয়টি গ্রহণ করেছে। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন এর 118 নম্বর ধারায় বিনিময় সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। সম্পত্তি এওয়াজ বা বিনিময় এর খুটিনাটি বিষয় আমরা আজ কথা বলব।

মূল বিষয়গুলিঃ

সম্পত্তি এওয়াজ বা বিনিময় অর্থ কি?

এওয়াজ বা বিনিময় এর ইংলিশ সমার্থক শব্দ হচ্ছে “Exchange”। অর্থাৎ সম্পত্তি এওয়াজ বা বিনিময় বলতে বোঝায় এমন একটি আইনের নিয়ম যেখানে একজন ব্যক্তি তাঁর স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির বিনিময়ে অন্য আরেকজনের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি গ্রহণ করেন। তবে এই এওয়াজ বা বিনিময়ের ক্ষেত্রে কোন অর্থের লেনদেন থাকে না।

স্থাবর সম্পত্তি এওয়াজ বা বিনিময় আইনত বৈধ কিনা?

বাংলাদেশের সম্পত্তি হস্তান্তর আইন 1882 অনুযায়ী স্থাবর সম্পত্তির বিনিময় বৈধ। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন এর 118 নম্বর ধারায় বিনিময় এর সংজ্ঞা প্রদান করা হয়েছে। উক্ত ধারায় বলা হয়েছে দুই ব্যক্তি যে ক্ষেত্রে পরস্পরের একটি জিনিসের মালিকানায় বদলে অন্য একটি জিনিসের মালিকানা হস্তান্তর করে সে ক্ষেত্রে তার কোনো একটি জিনিস টাকা না হয়ে থাকলে আদান-প্রদানকে বিনিময় বলা হয়। বিনিময় সম্পত্তি হস্তান্তর উক্ত সম্পত্তির বিক্রয়ের ব্যাপারে যে পদ্ধতিতে হস্তান্তর করা হয়ে থাকে কেবল সেই পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা যেতে পারে।

একটি কার্যকর এওয়াজ বা বিনিময় এর কি কি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে?

একটি বিনিময় দলিল যেহেতু আইনত বৈধ। একটি কার্যকর বিনিময় দলিল এর বেশ কয়েকটি আবশ্যকীয় বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এই বৈশিষ্ট্য গুলি থাকলে সাধারণত ধরে নেয়া হয় যে বিনিময় বৈধভাবে করা হয়েছে।

সম্পত্তির বিনিময়ের বৈশিষ্ট্য সমূহঃ

  • বিনিময় দলিল টি অবশ্যই বিনিমেয়ের কৃর্তপক্ষ গণের মধ্যে স্বইচ্ছায় হতে হবে।
  • অবশ্যই দলিলটি রেজিস্ট্রিকৃত হতে হবে।
  • অবশ্যই দখল প্রদান করতে হবে।
  • বিনিময় টি অবশ্যই বিশ্বাসযোগ্য জমির বিনিময় অপর একটি বিশ্বাসযোগ্য জমির বিনিময় হতে হবে।

সম্পত্তি বিনিময় ও বিক্রির মধ্যে পার্থক্য কি?

সম্পত্তির বিনিময় এর মধ্যে বেশ কয়েকটি পার্থক্য বিদ্যমান রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বিনিময় হলো এক সম্পত্তির বিপরীতে অন্য আরেকটি সম্পত্তি প্রদান করা। অন্যদিকে সম্পত্তি বিক্রি হচ্ছে টাকার বিনিময় কোন সম্পত্তি অন্যজনকে প্রদান করা। নিম্নে আমরা এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা করব।

  1. সম্পত্তি বিনিময় হলো একটি সম্পত্তির পরিবর্তে অন্য একটি সম্পত্তি প্রদান করা। আর সম্পত্তি বিক্রয় হল টাকার বিনিময় কোন সম্পত্তি হস্তান্তর করা।
  2. বিনিময়ের ক্ষেত্রে অন্য একটি বিরাট বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিনিময় সম্পত্তি অগ্ধকারের কোন প্রশ্ন আসে না। অপরদিকে বিকৃত সম্পত্তি ফেরত নেওয়া যায়।
  3. বিনিময় কৃত সম্পত্তির ক্ষেত্রে কোন সম্পত্তির পরিমাণ যদি কম হয়ে থাকে তার পরিবর্তে কিছু টাকা বা অর্থ প্রদান করা যায়। অপরদিকে সম্পত্তিতে শুধুমাত্র অর্থ লেনদেন হয়ে থাকে কোন প্রকারের সম্পত্তির বিনিময়ে সম্পত্তি প্রদান করা হয় না।
  4. বিনিময়ের ক্ষেত্রে প্রত্যেক পক্ষগণ একে অপরের সম্পত্তিতে সত্যবান ও দরকার হয়ে থাকেন। অপরদিকে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে একজন টাকা অর্থের বিনিময়ে তার কাছ থেকে অর্থ নিয়েছেন তার নিকট হস্তান্তর করতে নিঃস্বত্তবান হয়ে থাকেন।

সম্প্রতি বিনিময়ের ফলাফল কি?

যদি একটি স্থাবর সম্পত্তির সহিত অন্য আরেকটি স্থাবর সম্পত্তি বিনিময় করা হয় এবং বিনিময় অনুযায়ী প্রত্যেকে প্রত্যেকের জমিতে দখল প্রাপ্ত হয়ে থাকেন। তখনই, সাধারণভাবে মনে করা হয় উক্ত বিনিময় সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তবে, এখানে মনে রাখতে হবে যে বিনিময় দলিল যথার্থ হতে হবে। আমি একটা উদাহরন দিয়ে যথার্থ বিনিময় দলিল কি সেটা বোঝানোর চেষ্টা করব।

ধরুন আপনার 50 শতক জমি আছে। আপনার এই জমিটা কিছুটা কম মূল্যবান এবং আপনার চাচাতো ভাই অথবা ভাইয়ের কিছুটা মূল্যবান 40 শতক জমি আছে ওই জমিটা সাথে আপনি এই জমিটার বিনিময় করেছেন ও দখল হস্তান্তর হয়ে গিয়েছে। আপাতদৃষ্টিতে, এই বিনিময় সঠিক। কিন্তু আপনার 50 শতক মূল্যবান জমি আছে, উক্ত জমির সহিত আপনার চাচাতো ভাইয়ের 40 শতক কম দামী জমির বিনিময় করলেন এটা সাধারণত ধরে নেয়া হয় যে বিনিময় টি কোন ছলচাতুরির মাধ্যমে করা হয়েছে। আদালতে এইসব বিনিময় দলিল বাতিল হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।

বিনিময় কৃত সম্পত্তি দলিল বাতিল করা যায় কিনা?

বিকৃত সম্পত্তির দলিল অবশ্যই বিজ্ঞ আদালত মাধ্যমে বাতিল করা সম্ভব। ধরুন সম্প্রতি বিনিময় হয়েছে কিন্তু যেভাবে বিনিময় হওয়ার কথা ছিল অর্থাৎ আপনাকে যতটুকু দেয়ার কথা ছিল তা দেয়া হয়নি বরঞ্চ তার থেকে কম সম্পত্তি বিনিময় হিসেবে দেওয়া হয়েছে এ বিষয়টি আপনি অনেক পরে জানতে পেরেছেন । তবে, অবশ্যই আপনি বিজ্ঞ আদালতে মামলা করতে পারেন এবং মামলা করে উক্ত দলিল বাতিল যেতে পারেন।

বিনিময় দলিল বাতিলের মামলা কত দিনের মধ্যে করা উত্তম?

সাধারণত বিনিময় দলিল বাতিলের মামলা তামাদি আইন অনুযায়ী দলিল করার তিন(3) বছরের মধ্যে করা উত্তম। তবে আপনি জানার পরেও যেকোনো সময় উক্ত দলিলের সার্টিফাইড কপি তুলে মামলা করতে পারেন এতে আপনার তামাদি বজায় থাকবে।

কোর্ফা প্রজা কোর্ফা সম্পত্তি এওয়াজ বা বিনিময় করতে পারেন কি?

বেঙ্গল টেন্যান্সি এ্যাক্ট,1885 অনুযায়ী র্কোফা প্রজা কোর্ফা সম্পত্তি কোন প্রকারের হস্তান্তর করতে পারেন না। তবে এই আইনটি 1938 সালে সংশোধন করা হয়। 1 938 সালের সংশোধন 48F এ অনুযায়ী কোর্ফা প্রজা তার সম্পত্তি মূল মালিকের নিকট থেকে অনুমতি গ্রহণ করতো উক্ত সম্পত্তি যে কোনো ধরনের বিক্রয়, দান, এওয়াজ বা যে কোনভাবে হস্তান্তর করতে পারেন। সুতরাং, কোর্ফা প্রজা তার সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন তা আইন দ্বারা সিদ্ধ।

কোর্ফা সম্পর্কে যানতে এই পোষ্টটি দেখুন।

এওয়াজ বা বিনিময় করার পর উক্ত সম্পত্তি বিক্রয় করলে তা সঠিক হয় কি?

এওয়াজ বা বিনিময়কৃত সম্পত্তি প্রত্যেক পক্ষ দখল পেয়ে ভোগদখল থাকার পর কোন পক্ষের প্রাপ্ত সম্পত্তি সেই পক্ষ বিক্রয় করে দখল হস্তান্তর করে দিলে তা অব্যশ্যেই আইনসিদ্ধ ও বৈধ হবে। উক্ত ক্রয়কৃত সম্পত্তিতে ক্রেতার বৈধ স্বত্তের উদ্ভব হইবে।

সম্পত্তি এওয়াজ বা বিনিময় করার পর উক্ত সম্পত্তি যদি কোন পক্ষ বিক্রয় করে এবং সেই পক্ষ যদি উক্ত এওয়াজ বাতিল করতে চায়, তবে তিনি তা পারবেন কি?

এই বিষয়ে আলোচনা করতে হলে প্রথমে যানতে হবে এওয়াজ কখোন সম্পন্ন হয়। এওয়াজ বা বিনিময় সম্পন্ন হতে হলে প্রত্যেক পক্ষকে তাদের এওয়াজকৃত জমি একে অপরকে দখল বুঝিয়ে দিতে হয়। দখল বুঝিয়া পাওয়ার পরও যদি কোন পক্ষ উক্ত এওয়াজ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তবে আদালতে মামলা করতে পারেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, বিনিময় করার পর উক্ত সম্পত্তি যদি কোন পক্ষ বিক্রয় করে এবং সেই পক্ষ যদি উক্ত এওয়াজ বাতিল করতে চায়, তবে তিনি তা পারবেন কি? চলুন এই প্রশ্নের উত্তর খোজার চেষ্টা করি। এওয়াজ সাধারণত দুইটি পক্ষের মধ্যে হয়ে থাকে। উভয় পক্ষ উক্ত এওয়াজ মেনে নিয়েই এওয়াজকৃত জমি দখল করেন।

কোন পক্ষ তার এওয়াজে প্রাপ্ত জমি যে কোন ব্যক্তির কাছে বিক্রয় করে দখল হস্তান্তর করতে পারেন। এখন ঐ বিক্রেতা আর ঐ এওয়াজ বা বিনিময় বাতিলের মামলা করে কোন ফল পাবেন না। কারন, তিনি তার এওয়াজ বা বিনিময় দলিল স্বীকার করে নিয়েই তার জমি বিক্রয় করেছেন।

সম্পত্তি এওয়াজ বা বিনিময় করার পর উক্ত এওয়াজ বাতিলের জন্য কোন পক্ষ এওয়াজ বা বিনিময় বাতিলের মামলা করতে পাবেন?

এওয়াজ বা বিনিময় বাতিলের জন্য যে পক্ষ উক্ত এওয়াজ বা বিনিময় দলিল নিয়ে অসন্তুষ্ট সেই এওয়াজ বা বিনিময় দলিল বাতিলের জন্য আইন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা করেতে পারবেন।

সম্পত্তি এওয়াজ বা বিনিময় নিয়ে শেষের কিছু কথা:

এওয়াজ বা বিনিময় বর্তমান প্রচলিত আইনে বৈধ। সাধারনত এওয়াজ করার জন্য দুইটি পক্ষের প্রয়োজন হয়। এওয়াজ বা বিনিময়ের দলিলের কোন পক্ষিউক্ত ‍বিনিময় বাতিলের জন্য বিজ্ঞ আদালতে মামলা করতে পারবেন।

আজকে এওয়াজ বা বিনিময় নিয়ে এটুকুই। কোন সমস্যা বা প্রশ্ন থাকলে নিচে কমেন্টে যানান।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

3 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
ষেফালি মুখার্জি
ষেফালি মুখার্জি
11 months ago

মৌখিক বা দলিল না করে জমি বিনিময় করে উক্ত জমিতে ঘর বাঁধলে ঐ জমির মালিক জমি দাবী করতে পারে কিনা

3
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x
Scroll to Top