বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি কি বৈধ? আইন কি বলে?

বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি নিয়ে আমার এই লেখাটি ০১/০৯/২০২০ সালে ইংরেজিতে প্রথম প্রকাশ করেছিলাম। ওটার লিঙ্ক দিলাম। চাইলে ঘুরে আশতে পারেন। ভাল লাগবে

বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি নিয়ে কথা বলা এখনও সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। বছরের পর বছর, যৌনকর্মীরা অদৃশ্য, অস্বীকৃত ও মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত অবস্থায় জীবন যাপন করেছেন। কিন্তু ২০০১ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের একটি ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে এই পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।

এই রায়টি, রিট পিটিশন নং ২৮৭১/১৯৯৯ মামলার ভিত্তিতে, যৌনকর্মীদের আইনি ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে একটি মৌলিক পরিবর্তন আনে। এটি নিশ্চিত করে যে, যৌনকর্মীরাও নাগরিক—যাদের সংবিধান অনুযায়ী অন্যান্য নাগরিকদের মতোই অধিকার রয়েছে।

বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি কি বৈধ?

হ্যাঁ, বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি বৈধ, তবে এটি একটি জটিল আইনি ও সামাজিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে:

“রাষ্ট্র জুয়া ও পতিতাবৃত্তি নিরসনের চেষ্টা করিবে।”

তবে বাস্তবে, পতিতাবৃত্তি নিষিদ্ধ করে এমন কোনো স্পষ্ট আইন নেই। বরং বিভিন্ন আইন এই পেশার নানা দিক নিয়ন্ত্রণ করে:

  • Suppression of Immoral Traffic Act, 1933
  • Vagrancy Act, 1950 (বর্তমানে বাতিল)
  • Penal Code, 1860

যদিও প্রাপ্তবয়স্কদের পতিতাবৃত্তি বৈধ, নিম্নোক্ত কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ:

  • শিশু পতিতাবৃত্তি
  • জোরপূর্বক পতিতাবৃত্তি
  • প্রকাশ্যে যৌন ক্রিয়ার প্রস্তাব
  • অবৈধ বা লাইসেন্সবিহীন যৌনপল্লী পরিচালনা

একজন নারী যদি পতিতা হিসেবে কাজ করতে চান, তবে তাকে একটি হলফনামা জমা দিতে হয় যেখানে বলা থাকে যে তিনি স্বাধীনভাবে এবং অন্য কোনো পেশায় জীবিকা অর্জন করতে না পেরে এই পথ বেছে নিয়েছেন। নিবন্ধনের পর তিনি নির্ধারিত যৌনপল্লীতে কাজ করতে পারেন, যদিও এতে সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, বা রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা হয় না।

২০০১ সালের আগে আইনি সুরক্ষা: প্রায় অনুপস্থিত

যদিও পতিতাবৃত্তি সহ্যযোগ্য ছিল, তবুও যৌনকর্মীরা নিয়মিত হয়রানি, গ্রেপ্তার এবং “ভ্যাগ্র্যান্সি” (ভবঘুরে হওয়া) অভিযোগে আটক হতেন। তাদের ওপর নির্যাতন, বেআইনি আটক এবং নিজের জীবনচর্চার পথ বেছে নেওয়ার অধিকার হরণ করা হতো।

এই অমানবিক অবস্থা বদলে যায় ২০০১ সালের হাইকোর্ট বিভাগের ঐতিহাসিক রায়ে।

ঐতিহাসিক রায়:  53 DLR (HCD) 1

এই মামলায়, মাননীয় হাইকোর্ট একটি শক্তিশালী রায় প্রদান করেন যা যৌনকর্মীদের প্রতি আইনি আচরণ আমূল পরিবর্তন করে। রায় টি 53 DLR(HCD) 1 এ প্রকাশিত হয়। মহামান্য হাইকোর্ট উক্ত রায়ে বলেন: বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি নিষিদ্ধ নয়।

তাই, যৌনকর্মীরা সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার ভোগ করবেন—যেখানে জীবনের অধিকার ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষিত হয়েছে।

টানবাজার ও নিমতলীর যৌনপল্লী থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ এবং তাদের ভবঘুরে বলে আটক করাকে অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হয়।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব যৌনকর্মীদের জীবিকা অর্জনের অধিকার রক্ষা করা, এবং পুনর্বাসন পরিকল্পনাকে ব্যক্তিগত মর্যাদা ও পছন্দের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে।

এই রায়ের ফলে একটি নীতিগত পরিবর্তন ঘটে: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন জাতীয় ভোটার আইডিতে “পতিতাবৃত্তি”কে একটি পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়—যার ফলে যৌনকর্মীরা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, সন্তানের জন্ম নিবন্ধন, এবং অন্যান্য নাগরিক সেবার সুযোগ পান।

পতিতাবৃত্তি সংক্রান্ত প্রাসঙ্গিক আইনসমূহ

১. Suppression of Immoral Traffic Act, 1933

এই আইনে ‘বেশ্যালয়’ বলতে বোঝানো হয়েছে এমন একটি স্থান যেখানে দুই বা ততোধিক নারী যৌনসেবার মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করেন।

স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতিক্রমে এসব যৌনপল্লী পরিচালনা করা যায়।

২. Penal Code, 1860 – ধারা ৩৭২

এই ধারায় শিশু পাচার ও যৌন শোষণ অপরাধ হিসেবে বিবেচিত:

“যে ব্যক্তি কোনো ১৮ বছরের কমবয়সী কিশোর/কিশোরীকে পতিতাবৃত্তি বা অনৈতিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে বিক্রি করে বা ভাড়া দেয়, সে দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।”

এই ধারা অনুযায়ী, যদি কোনো মেয়ে ১৮ বছরের নিচে হয়ে পতিতাবৃত্তির জন্য কারো হাতে তুলে দেওয়া হয়, তবে সেই ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে দোষী ধরা হবে, যদি না বিপরীত কিছু প্রমাণিত হয়।

৩. Solicitation বা প্রস্তাবনা

Penal Code-এর ধারা ২৯০ এবং স্থানীয় আইন অনুযায়ী, প্রকাশ্যে যৌনসেবা প্রদানের প্রস্তাব দেওয়া অপরাধ।

হাইকোর্টের পুনর্বাসন সংক্রান্ত পর্যবেক্ষণ

আদালত উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যেকোনো পুনর্বাসন কার্যক্রম:

  • ব্যক্তিগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করতে পারবে না।
  • স্বেচ্ছাধীন হতে হবে, জোরপূর্বক নয়।
  • শিক্ষার সুযোগ, অর্থনৈতিক বিকল্প, এবং পারিবারিক সংযুক্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।
  • “নৈতিক উৎকর্ষতার” নামে জোরপূর্বক বা দীর্ঘমেয়াদি আটক এড়াতে হবে।

কেন ২০০১ সালের রায় এত গুরুত্বপূর্ণ

এই রায় ছিল বাংলাদেশের মানবাধিকারের ইতিহাসে এক মাইলফলক। এটি সূচনা করেছিল:

  • যৌনকর্মীদের সমান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি।
  • আইনি সুরক্ষা—জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও বেআইনি আটকের বিরুদ্ধে।
  • একটি সামাজিক পরিবর্তনের—যদিও ধীরে—যেখানে যৌনকর্মীদের মানবিক মর্যাদা স্বীকার করা শুরু হয়।

আদালত যথার্থই বলেছেন, “যৌনকর্মীরা প্রথমে মানুষ, পরে পেশাজীবী”। তারা যদি স্বাধীনভাবে পেশা বেছে নেন, তাহলে তাদের অধিকার হরণ করা যাবে না।

চূড়ান্ত মন্তব্য

বাংলাদেশে পতিতাবৃত্তি একটি বৈধ কিন্তু কলঙ্কিত পেশা। যদিও আইন এটি অনুমোদন করে, তবুও সমাজে গভীরভাবে প্রোথিত মানসিকতা যৌনকর্মীদের বিরুদ্ধভাবাপন্ন করে তোলে। কিন্তু ২০০১ সালের হাইকোর্টের রায় এক সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছিল:

  • মানবাধিকার সবার জন্য—শুধু গুটিকয়েকের জন্য নয়।
  • যেমন বলা হয়, “ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি নেই।” এই রায় বহু বছরের অন্যায়ের অবসান ঘটিয়েছে।

বাংলাদেশ এমন একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে, যা অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এখনও নিতে পারেনি। এটি মানবিক মর্যাদাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সুবিচারের পথ তৈরি করেছে—পেশা যাই হোক না কেন।

লেখাটি আপনার ভালো লেগেছে? শেয়ার করুন এবং মতামত জানান। আরো এ ধরনের লেখা পড়তে আমাদের সাইটে চোখ রাখুন।

Add tag…

Leave a ReplyCancel reply

error: Content is protected !!
Scroll to Top
Exit mobile version